ছিদ্র রাষ্ট্রকে চেপে ধরে আছে অবুঝ বালক!

বাংলাদেশ

 বনানীতে এফআর টাওয়ারে আগুন লাগার ঘটনায় অনেকে অনেক ধরনের ছবি ফেসবুকে আপলোড করেছেন। তার মধ্য থেকে একটি ছবি বেশ ভাইরাল হয়েছে…!!

ছবিটি দেখা যায় আতঙ্ক আর চোখে মুখে প্রবল দাবদাহ নিয়ে ‘ছিদ্র রাষ্ট্র’কে চেপে ধরে আছে এক অবুঝ বালক! এরপর থেকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে যে যার জায়গা থেকে নাইমকে নিয়ে রীতিমতো লেখালেখি করছেন।

আমাদের দেশে লক্ষনীয় একটি বিষয় সবসময় চোখে পড়ে। প্রিয় মাতৃভূমিতে ভয়াল কোন কাণ্ড ঘটলে কেউ জীবন বাজি রেখে কঠিন মুহুর্তে পাশে দাঁড়ায়। কেউ সেই কাণ্ডকে ঘিরে রাজনীতি করে, কেউ কেউ বেশ সুবিধাও ভোগ করে থাকে। সবশেষে উপরের মহল থেকে একখান কথা ভেসে আসে, অতি দ্রুত তদন্ত কমিটি ঘটন করা হবে, খতিয়ে দেখা হবে এর মূলে রহস্য কি, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

ভয়াবহ যে কোন ধরনের ঘটনা ঘটলে এমনটা হয়ে থাকে বাংলাদেশে। তাই সকলের জানা, যে কোন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে কি হতে পারে শেষে। অনেকটা বলা যায় বহুল প্রচলিত সেই প্রবাদের মতো, ‘ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া দেয়া।’

এমন প্রবাদের সত্যতা পেতে বেশি দূর যেতে হয় না। আপনার চোখের সামনে ঘটছে নিয়মিত। আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে একটি ঘটনার সাক্ষী আছি। আমি যখন নবম শেণিতে পড়ি, তখন এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটে আমাদের অঞ্চলে। ২৬ নভেম্বর ২০০৯। ভোলার লালমোহনে, নাজিরপুর ঘাট থেকে কয়েক গজ দূরে যাত্রীবাহি লঞ্চ এমভি কোকো-৪ ডুবে যায়। সেই ঘটনায় ৮৪ জন যাত্রীর প্রাণহানী ঘটে। আর তীরে থাকা মানুষদের প্রশসংসা করতেই হয়। সেখানকার মানুষ অনেকের জীবন বাঁচিয়েছেন যেমন সত্য, তেমন সত্য যে তারা চাইলে আরো কিছু জীবন হয়ত বাঁচাতে পারতেন। সেখানকার উদ্ধারকারী মানুষদের মধ্য ছিলেন কতিপয় মানুষরুপী অমানুষ। মৃত্যুর সাথে লড়াই করা মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে ছিনিয়ে নিয়েছেন তাদের সম্পদ!

আমি হয়ত উদাহরণ দিতে প্রায় একদশক আগের ঘটনা উল্লেখ করেছি। প্রতিনিয়তই এমনটা আমাদের চোখের সামনে হয়ে থাকে। স্বত্বত্যাগ করে মানুষের পাশে দাঁড়ান। ২০০৭ সালে নাসরিন লঞ্চ ডুবির ঘটনায় যারা প্রাণে বেঁচে এসেছেন তাদের কাছ থেকে শুনেছি, ওই সময় অনেকে তিমির পিঠে বসে আশ্রয় নিয়েছেন। কই, ক্ষুধার্ত তিমি কঠিন বিপদে আচ্ছন্ন মানুষকে তো খায়নি?তাহলে আমরা সৃষ্টির সেরা হয়ে কেন এমন হলাম? মানুষের ভীড়ে কেন প্রকৃত মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন?

গতকালের ঘটনায় অনেকে সেলফিতে মত্ত ছিলেন। নোংরা সমাজের লাখ সেলফিবাজদের ভিড়ে নাম না জানা সেই বালকের চিত্র হৃদয়ে কম্পন সৃষ্টি করছে। অনেকের ঘুমিয়ে থাকা মনকে জাগ্রত করছে। এরপর থেকে সেই বালককে নিয়ে লিখছি, তোমার ঋণ সুধরাবার নয়, তুমি ইতিহাসে জায়গা করে নিবে।

সত্যি কি সেই ছোট্ট ছেলেটি ইতিহাসে জায়গা করে নিবে? ভুল। ওর জম্ম এমন একটি ভূমিতে,যাদের কাছে ইতিহাস বলতে কিছু নেই। নেই ইতিহাসের শিক্ষাও। ওরা ইতিহাসকেও ক্ষত-বিক্ষত করে সময়ের ব্যবধানে। অনুজের এমন বিচক্ষণতা নিয়ে রাষ্ট্র কোনো কথা বলবে না!ওরা এমন আসবে আর কয়েক দিন আলোচনায় থেকে ফের হারিয়ে যাবে।

শিরোনামে ‘ছিদ্র রাষ্ট্র’ কথা উল্লেখ করায় হয়ত অনেকে কষ্টে পেয়েছেন। বিপরীত অনেকে ‘ছিদ্র রাষ্ট্র’ সঠিক বলে মনে করবেন। কিন্তু বাস্তবে কেমন আছে প্রিয় মাতৃভূমি? সমস্যা দেখলে কেন সমালোচনা করা যাবে না? বিশ্বায়নের এই যুগে আমাদের দেশে বড় ধরনের কোন সমস্যা হলে উত্তরণের পথ খুঁজে পাই না। কেন আগুন লাগলে ভাঙা বালতিতে করে পানি নেয় বিমান?আর পত্রিকায় শিরোনাম হয়, ‘উদ্ধার কাজ পরিচালনা করছেন বিমান এবং নৌ সেনারা’।

ছিদ্র রাষ্ট্র বলে আমি দেশকে ছোট করতে চাইনি। ছিদ্র হওয়ার পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের বুঝাতে চেয়েছি। এমন লেখায় আবার কিছু মহল বেশ খুশি হয়েছেন। তাদেরও তো দোষ কম নয়। রাষ্ট্রকে ছিদ্র করে রেখেছি, আপনি এবং আমরা সবাই।

অর্থনীতির একজন ছাত্র হিসেবে বলতে চাই, রাষ্ট্রের পক্ষে একা কখনও উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। চাই জনগণের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। কিন্তু আমরা তো সেই জনগণ, যারা উন্নয়নকে মুছে ফেলি! আমি অবাক হয়ে যাই আমাদের সকলের কল্যাণের লক্ষ্যে দুই সিটি মেয়র রাজধানীতে কি সুন্দর একটি পরিকল্পনা নিয়েছিল। ময়লা রাখার জন্য ‘ঝুড়ি’র ব্যবস্থা করে ছিলেন। আর আমরা সব বিক্রি করে দিয়েছি! জাতির ভাগ্যের পরিবর্তনের পথে উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যেমন দায়ী আমরাও কম নই। শুভ বুদ্ধির উদয় হোক সবার। শান্তির বাতাশ আসুক প্রত্যেকের আঙিনায়। সর্বোপরি বনানীতে যারা নিহত হয়েছেন তাদের শোকসপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা…!!

Leave a Reply